Tuesday , December 10 2019
Breaking News
Home / শিক্ষা মূলক / উপন্যাস / মায়া। একটি ভালোবাসার গল্প

মায়া। একটি ভালোবাসার গল্প

#মায়া

কে আপনি মেহমুদ আবার জিজ্ঞাসা করে।
মেয়েটি বলে আমি জারীন…..
মেহমুদ এবার ভালো করে মেয়েটির দিকে তাকায় ,মেয়েটি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে।কি সুন্দর মুখখানা।লাবন্য যেন খেলা করছে মুখখানায়।কি সুন্দর।
কই বললেন না তো আপনি কে? জারীন আবার প্রশ্ন করে
মেহমুদ একটু বিহবল হয়ে যায়।ইনিই জারীন।বেশ তো মেয়েটা।
তার বিহবলতা কাটতে একটু সময় লাগে। বলে,
আমি মেহমুদ।মাহিমের ভাই।
মাহিম কি আপনাকে আমার কথা বলেছে।
আমি অনেক বছর পর দেশে এলাম।
——ওয়েল, ওয়েল। বাহ্! চমৎকার।
——–চলে এসেছেন।ভালই।
——-ভাই মরতে না মরতে চলে এসেছেন।তা কেন এসছেন হঠাৎ করে।
জারীন মেহমুদের দিকে কঠিন মুখ করে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে।
এবার মেহমুদ অবাক হয় বলে, মানে……..
মানে খুব সহজ মি.মেহমুদ। কেন এসছেন।কি কারন
এতদিন আপনার তো কোন খোঁজ খবর ছিল না।
কোন যোগাযোগ ছিলো না।হঠাৎ কোথা থেকে আপনার আগমন হল।কোথা থেকেই বা উদয়ন হলেন।জারীনের মুখে বিদ্রুেরূপের হাসি ফুটে উঠে।।
মেহমুদ বলে দেখুন, আমি অনেক দূর থেকে বাচ্চাদের দেখতে এসেছি।
এখানে এত প্যানিক হওয়ার মত কিছু নাই।আপনি অযথা এসব বলছেন।আজব তো।মেহমুদের বিরক্তি লাগছে
বাহ্, তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন।
আজ হঠাৎ এত দরদী হয়ে গেলেন যে।জারীন বলে উঠে
মেহমুদ জারীন এর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকায়। দেখে, জারীন এর মুখে মৃদু হাসি কিন্তু তার চোখ হাসছে না।কি শীতল, তার চোখে কোন মায়া নেই।
ভাবলেশহীন একটা মুখ
যেন পিশাচ একটা,
মেহমুদ জারীনের চোখে চোখ রেখে বলে হ্যাঁ, এতদিন খোঁজখবর নেওয়া হয় নাই।
এবার থেকে নেওয়া হবে।এখন থেকে আমি এই বাড়িতে থাকবো।
দয়া করে আমার রুম দেখিয়ে দিন
এখানে থাকবেন মানে…..
জারীন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে..
আপনি মনে হয় ভুলে যাচ্ছেন যে, আমি এই বাড়ির ছেলে।মেহমুদ বলে
না। না।কখনই না।।
আপনি এখানে থাকতে পারবেন না।
এটা আমার বাড়ি। জারীন হিস হিস করে বলে উঠে।
এবার মেহমুদ হাসে বলে,আমাকে বাঁধা দেওয়ার আপনি কে।বরং আপনি এখানে অনাকাঙ্ক্ষিত মেহমান।।আপনি আপনার কাজে যান।আপনি অযথা রাগ করছেন।
কি, আমার বাড়ীতে এসে আমাকে অপমান করা।
বের হন বলছি মি:মেহমুদ।
এখনই আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যান,
নইলে……..
রাগে জারীন কাপতে থাকে।
কার বাড়ি সেটা না হয় পরে ঠিক হোক।আপাতত আমার বিশ্রাম এর প্রয়োজন।
আপনার সাথে কথা বলে আমার সময় অপচয় হচ্ছে।
ঠিক আছে, আপনার সাথে পরে কথা বলি।
সিয়াম জারা চলো আমাকে রুম দেখাও।
আর হ্যাঁ অনেকদিন পর বাংলাদেশে এসেছি ভালো কিছু রান্না করবেন।
দুপুরে একসাথে খাবো।তখন কথা বলব,বলে মেহমুদ আর দাঁড়ায় না, বাচ্চাদের নিয়ে দোতালায় চলে যায়।
মেহমুদ পিছনে তাকায় না তাকালে সে দেখতে পেতো সুন্দর মুখের আড়ালে একটা কদর্যমাখা রূপ।

মেহমুদ দোতালায় তার রুমের জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়।এখান থেকে বড় আমগাছটা দেখা যায়।ছোটবেলায় সে আর মাহিম কত আম পেরে খেয়েছে এই গাছটা থেকে।
এই গাছটা তার কত চেনা।
আজ এত বছর পর ঠিক একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
যেন সে বলছে তোমরা একেক জন আসো আর যাও আমি  দাড়িয়ে থাকি বহু বছর ধরে তোমাদের প্রতীক্ষায়।তোমাদের অতিতের সাক্ষী হয়ে।।
একবার তো মেহমুদ গাছ থেকে পরে হাত ভেঙে ফেলে।
একমাস তার হাতে প্লাস্টার ছিলো সেই সময় মাহিম ই তার দেখাশোনা করে।
মেহমুদ পুরনো কথা ভেবে একটু আনমোনা হয়ে যায়।

আজ দুপুরে জারীন বাসায় ছিলো না।কোথায় নাকি গিয়েছে।রান্না ও করে নাই।বাড়ির কাজের লোকেরাই সব করেছে।
দুপুরে মেহমুদ জারার গালে অনেকক্ষন বরফ ঘসেছে।
জারার গালটা লাল হয়ে ফুলেছিলো।এখন কিছুটা কমেছে।ছোট একটা মানুষ। আহারে।মা নাই, বাবা নাই।
কি অসহায়।এই সময় মায়ের কোলে থাকার কথা।আর আজ….
জারার দিকে তাকালে মাহিমের কথা মনে পরে।জারার মুখের আদলটা অনেকটা মাহিমের মত।মেহমুদের কেমন একটু একটু মায়া লাগছে।
সিয়াম ও জারা খেয়ে দেয়ে ওদের রুমে ঘুমাতে গিয়েছে।
যেতে চায় নাই।
তাদের গল্প শেষ হয় না। মেহমুদ কে তারা কত যে প্রশ্ন করেছে তার শেষ নাই।মেহমুদ ও তাদের সব প্রশ্নের উওর দিয়েছে। সে কোথায় ছিলো। এতদিন সে কেন আসে নাই।আমেরিকা কি রকম।
আরো কত যে প্রশ্ন তার শেষ নাই।মেহমুদ হাসি মুখে তাদের সব প্রশ্নের উওর দিয়েছে তারপর তাদের জোড় করে তাদের রুমে পাঠিয়েছে একটু রেস্ট নেওয়ার জন্য।

এখন সে একাকী কিছুুক্ষন নিজের মত থাকতে চায়।
নিজের ভাবনাগুলো নিজের মত করে ভাবতে চায়।
সে কি করবে বুঝতে পারছেনা………
এখানে বাচ্চাগুলোর কোন যত্ন হচ্ছে না।ওরা আগে স্কুল এ যেতো এখন যায় না।
ঘুম থেকে নাকি কেউ ওদের উঠায় না।তাই যেতে পারে না।
কি খেলো না খেলো এসব ব্যাপার গুলো দেখার কেউ নাই।কেউ দেখে না।
সবাই যার যার কাজ নিয়া পরে আছে।কি অবস্থা।
মেহমুদ ভেবেছিলো তার নামে যা জায়গাজমি পাবে তা বাচ্চাদের নামে দিয়ে দিবে তারপর ওদের কে কোন একটা অনাথ আশ্রমে দিয়ে সে আমেরিকা চলে যাবে।
কোন ঝামেলায় জড়াবে না।কিন্তু জারীন মনে হয় এটা হতে দিবে না।ও ঝামেলা করবে।
অনেক বছর পর মেহমুদ বাংলাদেশ এ এসেছে।অনেকেই তাকে চেনে না।
জারীন খুব সহজে কোর্ট এ প্রমান করে দিবে যে সে কেউ না।
তখন আর কিছুই করার থাকবে না।
মেহমুদের খুব বিরক্তি লাগছে।
বাবার দলিল টা কোথায় ঔইটা পেলে খুব ভালো হতো।
নিজাম সাহেবের সাথে কথা বলা দরকার।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়া দরকার।
সে কোন মায়ার বাঁধনে জড়াতে চায় না।তাই হয়তো আজ অবধি তার সংসার হয় নাই।এইসব থেকে দূরে থেকেছে সব সময়।
অথচ তাকে এখন এসব পোহাতে হচ্ছে।
এ ঝামেলা থেকে কবে মুক্তি মিলবে সে জানে না……

মেহমুদ নিজাম সাহেবের চেম্বার এ বসে আছে।
নিজাম সাহেব ,এখন কি করবো, বলে দেন মেহমুদ মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করে।।
ঐ বাড়িতে উঠে ভালো একটা কাজ করেছো মেহমুদ।
এখন দলিলপত্র টা পেলে খুব ভালো হতো।
আমরা যদি কোর্ট এ বলি তুমি সোবহান সাহেবের ছেলে তুমিই এখন সকল সম্পাতির উওরাধীকারি। কেউ বিশ্বাস করবে না।
আমাদের কাছে কোন প্রমান নাই, জারীন এর উকিল খুব সহজে প্রমান করে দিবে তুমি কেউ না।তুমি ফ্রড।
তখন আমরা কেসটায় হেরে যাবো।
তোমার বাবা মায়ের বিয়ের রেজিস্ট্রির দলিলটা পেলে ও প্রমান করা সহজ হত তুমি সোবহান সাহেবের ছেলে।
মাহিমের অবর্তমানে সকল সম্পতির এবং তার সন্তানদের সাবালক হওয়া পর্যন্ত একমাএ অভিভাবক তুমি।
আফসোস আমাদের হাতে কোন প্রমান নাই।নিজাম সাহেব একনাগারে কথাগুলো বলে যান।
তো এখন কি করা,

নিজাম সাহেব বলে ভাবো মেহমুদ ভাবো।
কিছু পাও কিনা একটু চিন্তা কর।
হঠাৎ মেহমুদের ওসমান গনি চাচার কথা মনে পরে।
নিজাম সাহেব, ওসমান গনি চাচা বাবার বন্ধু।নেএকোনায় থাকতেন, উনি উকিল ছিলেন।
প্রায় সময় আমাদের বাসায় আসতেন।বাবা অনেক কিছু তার কাছে বলতেন। বাবা কি উনার কাছে কিছু রেখে গেছেন কি?একটু খোঁজ নিলে ভালো হত।
খুব ভালো, তাহলে নেএকোনায় যাও।একটু খোঁজ নাও।খুব ভালো হবে। নিজাম সাহেবের চোখমুখ খুশিতে ভরে উঠে।যাও একবার নেএকোনায়, নিজাম সাহেব বললেন।

বেলা চারটা
মেহমুদ ওসমান চাচার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
বাসার ঠিকানা বের করতে তার অনেক ঝামেলা হয়েছে।
মেহমুদ দরজা নক. করছে
একটু পর শ্যাম বর্ণের, হালকা পাতলা গড়নের একটি মেয়ে দরজা খুলে দেয়।মেয়েটি সবুজরং এর শাড়ি পরা।বয়স কত হবে মেয়েটার আনুমানিক ২৭/২৮
আরো কম কি?
লম্বাটে মুখ।ধারালো নাক।চুলগুলো সব এলোমেলো হয়ে আছে।
সামনের চুলগুলো বার বার মুখে চলে আসছে, মেয়েটি ও হাত দিয়ে বার বার ঠিক করে নিচ্ছে
কি মায়াময় মুখটা।তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।আহা কি সুন্দর।
সবুজাভ রংটা যেনো তার গায়ের সাথে মিশে আছে।মেয়েটা কি চোখে কাজল দিয়েছে।এত মায়া কেনো ঐ চোখে।মেহমুদ মোহমুগ্ধ হয়।
সে তাকিয়ে থাকে।মেয়টার গালে কয়েক ফোটা পানির ছিটে।
মেয়েটা কি কাঁদছিলো
হঠাৎ কণ্ঠস্বরে তার ধ্যান ভাঙে।
কাকে চাই? মেয়েটা বলে উঠে
মেহমুদ আমতাআমতা করে বলে উঠে,গনি চাচা আছেন।
আমি মেহমুদ।ঢাকা থেকে এসেছি।দরকার ছিলো। একটু ডেকে দিবেন
বাবা কে ডাকবো? বাবা তো নেই।আজ আঠারো দিন হলো বাবা মারা গিয়েছে।বলেই মেয়েটার চোখ ছলছল করে উঠল।
মেহমুদের সকল আশা নিমিষেই যেনো শেষ হয়ে যায়।মেহমুদ কি বলবে ভেবে পায় না।তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।একটু পানি খেতে পারলে ভালো লাগতো।
মেয়েটি মনে হয় মেহমুদের অবস্থা বুঝতে পারছে
আসুন ,ভিতরে এসে বসুন। বলেই মেয়েটি দরজা ছেঁড়ে দাঁড়ায়
মেহমুদ ঘরে ঢুকে ধপ করে চেয়ারে বসে পরে।
সে কি হেরে যাবে।তার মাথায় কিছু ঢুকছে না।
এমন সময় মেয়েটি এক গ্লাস পানি নিয়ে ঘরে ঢুকে।
মেহমুদ এক চুমুকেই পানিটা শেষ করে ফেলে
ধন্যবাদ আপনাকে ।মেহমুদ বলে
জ্বি,আমার নাম রাবেয়া।বাবার কাছে আপনার কি দরকার ।আমাকে বলতে পারেন
মেহমুদ হতাশার সুরে বলে,আমি একটা দলিলের খোঁজে এসেছিলাম।চাচা নেই এখন মনে হয় না আর পাওয়া যাবে।
বসার রুমের সাথে ঐ রুমটা বাবার চেম্বার।ওখানে বসে বাবা কাজ করতো ।ঐ রুমের আলমারি তে অনেক দলিল ও কাগজপত্তর রাখা আছে।আপনি চাইলে ওখানে দেখতে পারেন।
মেহমুদ যেনো আশার আলো দেখতে পায়,বলে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।এতটুকু আমার উপকার করেন।
ঠিক আছে আমি চাবি নিয়ে আসছি।এই বলে রাবেয়া উঠে যায়
মেহমুদ একা রুমে বসে থাকে……….

চলবে।।

About Bithi Sultana

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *