Friday , October 18 2019
Breaking News
Home / শিক্ষা মূলক / গল্প / ঠগী কাদের বলে?

ঠগী কাদের বলে?

আপনারা কি জানেন ঠগী কাদের বলে?

ঠগীরা ১৩ থেকে ১৯ শতকে বাংলায় এবং উত্তর ভারতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তাদের কথা প্রথম জানা যায় ১৩৫৬ সালে ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানি লিখিত ‘ফিরোজ শাহর ইতিহাস’ গ্রন্থে। ১৮৩০ সালে গর্ভনর জেনারেল লর্ড বেন্টিক ভারতে প্রশাসক উইলিয়াম হেনরি শ্লীম্যানকে ঠগীদের নির্মূল করতে নির্দেশ দেন।
হেনরি শ্লীম্যান কয়েক বছরের চেষ্ঠার ফলে ঠগীদের নির্মূল করতে সমর্থ হন। কিছু হিসেব অনুযায়ী ১৭৪০ সাল থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত ঠগীরা ১০ লক্ষের বেশি মানুষ হত্যা করেছিল। ঠগীরা সাধারণত দলগতভাবে ব্যবসায়ী, তীর্থযাত্রীর কিংবা সৈন্যের ছদ্মবেশে ভ্রমণ করত এবং পথিমধ্যে অন্য তীর্থযাত্রীদের সাথে ভাল ব্যবহার করে তাদের সাথে মিশে যেত। তারপর তারা হঠাৎ করেই কোন যাত্রাবিরতিতে ভ্রমণকারীদের গলায় হলুদ রং এর কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করত। তাদের সম্পত্তি লুঠ করে মৃতদেহগুলোকে তারা হিন্দু দেবী কালীর নামে উৎসর্গ করত। হত্যার পর মৃতদেহগুলোকে একসাথে হাড় ভেঙ্গে কবর দিয়ে রাখত যাতে পচন প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়।

ঢাল নয়, তলোয়ার নয়, বোমা-পিস্তল-কামান-বন্দুক- কোন আগ্নেয়াস্ত্র নয়, তাদের একমাত্র হাতিয়ার হলুদ রঙের রুমাল। রুমাল নয়, ওরা বলত পেলহু। কিংবা – সিকা।
খুলে রাখলে মনে হবে যেন কোন পাগড়ী খুলে রাখা হয়েছে, অথবা “সাস”- কোমরবন্ধনী হিসেবে ব্যবহৃত কোন কাপড়। দু,ভাঁজে ভাজ করার পর সেটি দৈর্ঘ্যে মাত্র তিরিশ ইঞ্চি। আঠার ইঞ্চি দূরে একটি গিঁট। গিঁটের প্রান্তে একটি রুপোর টাকা বাঁধা। নয়তো তামার একটি ডবল পয়সা। হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে মেপে মেপে অতি যত্নসহকারে ওরা যখন সেটি তৈরি করে, তখন দেখলে কিছুই বোঝা যাবে না। রুমালটা আসলে একটা ফাঁস। প্রান্তে বাঁধা সিদুর মাখান টাকাটা তাকেই আরও নির্ভুল, আরও নিটোল করার জন্য।
ইতিহাসের আঁধার থেকে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর অদ্ভুত সম্প্রদায় কথা , যাদের কে বলা হতো – ওরা হৃদয়হীন মানুষ, ইতিহাসের হিংস্রতম, নিপুণতম খুনী- ওরা ঠগী।
ঠগী সম্প্রদায় শুরু হয়েছে কিছুটা অপ্রচলিত নিয়মে, বাস্তব আর কল্পনার মিশেলে, এদের দেখা গিয়েছিলো ব্রিটিশ ভারতবর্ষের বিশেষ সময়ে, এবং তার আগেও বছরে চল্লিশ হাজার লোক স্রেফ উধাও হয়ে যেত! তিনশ বছর এমন হয়েছে! কোন রকম পাত্তা মিলত না তাদের। কোথায় যেত তারা?

ঠগীদের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় তাদের আদি গোত্র মাত্র সাতটি মুসলিম পরিবার, এখান থেকে শাখা-প্রশাখা মেলে তারা শত শত বছরে। শিকারের সব নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন মেলে চলতে হত ঠগীদের, রক্তপাত ছিল সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ। বিশেষ করে সুবর্ণ যুগে নিজের থেকে জালে এসে ধরা দিলেও কায়স্থ, ফকির, কামার, কুমোর, ছুতোর মিস্ত্রী, গানের ওস্তাদ, নাচের মাস্টার বা গৃহপালিত গরু-মোষ নিয়ে রাস্তা হাঁটছে এমন কোন পথিককে হত্যা করা চলবে না। স্ত্রী লোকদের হত্যা নিষিদ্ধ ছিল প্রথম দিকে।
ভবানী দেবীর পূজারী ছিল ঠগীরা, তাঁর ইশারা ছাড়া কিছুই করত না, সারা বছরের স্বাভাবিক গৃহস্থগুলো যখন বর্ষা শেষে দিনক্ষণ দেখে শরতের ভোরে পথে নামল তখন তারা সম্পূর্ণ অন্য মানুষ, ভবানীর সন্তান। ওদের হাসি তখন হাসি নয়, কান্না তখন আর কান্না নয়, ওরা তখন ভিন্ন জগতের মানুষ- ওরা ঠগী, আপাদমস্তক শিকারি খুনি।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এখন স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বেদেদের বিভিন্ন গোত্র রয়েছে, যারা আসলে রূপান্তরিত ঠগি ছাড়া আর কিছু নয়। বৃহত্তর পাবনা জেলায় উনবিংশ শতকে ভয়ংকর গামছা মোড়া বাহিনীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, যারা আসলে ছিল ঠগি। তখনকার মত দমিত হলেও সে বিষবৃক্ষের ডালপালা বোধ হয় এখনও র‍য়ে গেছে, সে অঞ্চলের দস্যুদল থেকে শুরু করে তথাকথিত সর্বহারার দল পর্যন্ত ঠগিদের অনেক কৌশলই ব্যবহার করে বলে শোনা যায়। এখন চলন্ত ট্রেনের ছাদে যারা ডাকাতি করে এবং প্রায়শই হত্যা করে লাশ ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তাদের কৌশলও নাকি ঠগিদেরই মত, ওরাও ঠগিদের মত ফাঁস ব্যবহার করে।

সূএ :
জিয়াউদ্দীন বারনির “ফিরোজ সাহ ইতিহাস গ্রন্থ ” (১৩৫৬)। বইটিতে প্রথম ঠগীদের সম্পর্কে জানা যায়।
১৮৮৫ সালে প্রকাশিত “সেকালের দারোগার কাহিনী” তে লেখক গিরিশ বসুও বাংলার ঠগিদের সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেছেন। বইটিতে ঠগী সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন।
এছাড়া শ্রীপান্থ এর “ঠগী ” (১৯৬৩) বইটি থেকেও অনেক কিছুু জানা যায়। এবং ফেলুদা বইটিতে ঠগীর গামছার কিছু চিএ রয়েছে।

ছবিগুলো উইকি থেকে নেওয়া।

About Bithi Sultana

Check Also

লাল গোলাপ

লাল গোলাপ

লাল গোলাপ বহুকাল আগে গ্রামে এক কৃষক বাস করতো। তার ছিল একটি মাত্র কন্যা। তার …

One comment

  1. সুন্দর একটা গল্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *