Tuesday , November 12 2019
Breaking News
Home / উপন্যাস / মায়া, একটি ভালোবাসার গল্প

মায়া, একটি ভালোবাসার গল্প

মায়া

মেহমুদ বসে আছে গনি চাচার রুমে।সাথে আলি চাচা ও হেড স্যার আছেন।
রাবেয়া হয়তো তার ভিতরের রুমে।বিয়ের পর অনেকক্ষন যাবৎ মেহমুদ তাকে দেখেনি।
কোথায় গেলো !
তার মন কি তাকে খুঁজছে। অচেনা একজন মানুষের জন্য এত মায়া কেনো হয়।
মেহমুদের একটু আগে বিয়ে হয়ে গেছে।তার ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগছে।
অবস্থা, অবস্থান, পারিপার্শ্বিকতা অনুযায়ি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ঠিক ছিলো।
জানে না সামনে কি হবে।এইসব এখন আর ভেবে লাভ নাই।মানুষ তার আবেগের কাছ সব সময় পরাভূত।

মায়া, মমতা, ত্যাগ বহিভূর্ত যে মানুষ।সে আসলে মানুষ নয়।
মেহমুদ সেই রকম নয়।তাই সে নিজের দিকে না তাকিয়ে অন্যের জন্য বাঁচে।
এটাই বেঁচে থাকার সার্থকতা।

—-মেহমুদ তুমি কেন এখানে এসেছিলে।আলি চাচা জিজ্ঞেস করে।

—-আমি চাচা আমার বাবার করা একটা উইল এর খোঁজে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, ওসমান গনি চাচা বাবার বন্ধু।হয়তো উনার কাছে উইলের কোন কপি থাকতে পারে।

কিন্তু এখনও খুঁজে পাই নাই।আলমারির নিচের তাকটা খোঁজা অবশ্য বাকি আছে ওটা খোঁজা হয়ে গেলে ঢাকায় ফিরে যাবো।ওখানে কিছু কাজ শেষ করে সোজা আমেরিকায়।

—আলি চাচা মেহমুদের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি আজ যা করলা তা কেউ করে না,মেহমুদ। অলি চাচার চোখ ছল ছলছল করছে।
মেহমুদ, সবাই অপবাদ দিতে পারে, সেটার পরিনতি নিয়ে কেউ ভাবে না।
এর দায়ভার কেউ নিতে চায় না।
দোয়া করি তোমরা সুখি হও।
— আজ রাতেই কি তোমরা ঢাকায় চলে যাবে।

—জ্বী চাচা।মেহমুদ বলে
—ঠিক আছে,
এখন আসো আমরা আলামারি টা খুঁজে দেখি তোমার দলিলটা পাওয়া যায় কিনা।আলি চাচা হেসে বলে।
তাহলে তো খুব ভালো হয়।চলুন চাচা, একসাথে খুঁজি।মেহমুদ ও হেসে বলে।

রাবেয়া, রাবেয়া, কোথায় গেলি একটু চা দিয়ে যা।আলি চাচা চিৎকার করে ডাকতে থাকে।

রাবেয়া তার নিজের রুমে সে বিশ্বাস করতে পারছে না।তার একটু আগে তার বিয়ে হয়ে গেছে।
এভাবে কারো বিয়ে হয়।
তার কেমন কেমন জানি লাগছে।মেহমুদ তার স্বামী।মেহমুদ কে সে ভালোমত দেখেনি।
কথা ও ভাবে সে বলে নাই।আল্লাহই জানে সে কেমন।সে কি চায়।সে কি রকম।
তার খুব নার্ভাস লাগছে।বলা নেই কওয়া নেই কেমন হুটহাট করে সব ঘটেছে…….

তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।কি ভাবে কি যে হয়ে গেলো
তার একটু আধটু ভয়ও লাগছে
আবার তার মেহমুদের প্রতি একটু একটু মায়া ও লাগছে।
এমন লাগছে কেন……………
লোকটা মনে হয় ভালই।এই ভেবে মনে মনে সে হাসে ও
কেমন যেন একটা অনুভুতি বলে বুঝানো সম্ভব নয়
লোকটার সামনে যেতে এখন তার এখন লজ্জা করছে।আবার একটু একটু ভয় ও করছে।
ইশ,তার একটাও ভালো শাড়ি নেই।লোকটার সামনে একটা ভালো শাড়ি পরা তো উচিত।আবার ভাবে,থাক পরলে লোকটা যদি অন্য কিছু ভাবে।হেংলামো ভাবে।
দরকার নাই।যা পরে আছে। সেটাই থাক
সে আপন মনে এসব ভাবছে আর ভাবছে…………….
আলি চাচার ডাকে তার ভাবনায় ছেদ পরে।আলি চাচা চা দিতে বলছে
ইশ,লোকটার সামনে কিভাবে যাই।
চাচা ও না।তার হাত ঘেমে যাচ্ছে।বুকটা ধরফর করছে
এখন চা খাবার কি দরকার।আলি চাচার প্রতি তার কপট রাগ হয়।

রাবেয়া মাথায় ঘোমটা দিয়ে চা নিয়ে ঘরে ঢুকে
—চাচা চা।
চিনি ছাড়া কিন্তু।রাবেয়া মাথা নিচু করে বলে।
সে কার ও মুখের দিকে তাকাতে পারছে না।তার ভিষণ লজ্জা করছে।
—-কিরে বেটি কোথায় ছিলি।বুড়ো চাচা কে এক কাপ চা খাওয়াবি না।
নাকি জামাই কে একা একাই খাওয়াবি।বলেই আলি চাচা হো হো করে হাসতে থাকে।
সাথে হেড স্যার ও মেহমুদ যোগ হয়।।

রাবেয়া আলি চাচার দিকে কটমট করে তাকায়।কপট রাগ দেখায়।মনে মনে বলে,ইশ,চাচা যে কি না।যা মন চায় তাই বলে।।
মেহমুদ এবার আড় চোখে রাবেয়ার দিকে তাকায়।
ঘোমটা পরা রাবেয়াকে তো বেশ লাগছে।
সামনের চুল গুলো আবারো মুখে।মুখটা লাল হয়ে যাচ্ছে।
ওকি লজ্জা পাচ্ছে।এই লজ্জানত মুখটা একমাএ বাঙালি মেয়েদের ছাড়া
আর কাউকে মানায় না।
মেহমুদ আবার ও মোহমুগ্ধ হয়।

মেহমুদরা বাসের জন্য অপেক্ষা করছে।ফাইল শেষ পর্যন্ত বারান্দার স্টোর রুমের বক্সে ছিলো।
এবার ঢাকার উদ্দেশে যাএা, বাকি কাজ নিজাম সাহেব করবে।অনেক ঝামেলা হলো।আপাতত আর না।মেহমুদ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।

তাদের বিদায় দিতে আলি চাচা আর হেডস্যার এসেছেন।
রাবেয়া ব্যাগ হাতে এক কোনায় দাড়িয়ে আছে।আলি চাচা তাকে কিছু বলছে,
রাবেয়া মা শোন,
মানুষের জীবনে অনেক স্বপ্ন থাকে সেটা কখনও কখনও পূরণ হয় আবার কখনও কখনও হয় না।

তবে সে যেটা পায় সেটা নিয়ে যদি সে সন্তোষ থাকে তাহলে সে হয় সবচেয়ে সুখি মানুষ।
আমি জানি বিয়ে নিয়ে প্রতিটা মেয়ের অনেক স্বপ্ন থাকে।তোর ও ছিলো।তবে মনে রাখবি মা এর চেয়ে খারাপ কিছু ঘটতে পারতো আজ।
দোয়া করি, সুখে থাক, বলতে বলতে আলি চাচা কাঁদতে থাকে।
রাবেয়া ও কাঁদছে,
ওদের কান্না দেখে মেহমুদের ভিতরটা কেমন করে উঠে
আহা মানুষের প্রতি মানুষের এত মায়া কেন।।

মায়ার কারনে পৃথিবী আজও টিকে আছে।।
বাস ছেড়েছে ঘণ্টাখানিক হয়।
মেহমুদের পাশের সিটে রাবেয়া বসা।ওরা কেউ কোন কথা বলছে না।
রাবেয়া আপনি কি কিছু খাবেন।মেহমুদ নিরবতা ভেঙে বলে
রাবেয়া মাথা নেড়ে বলে, না
তাহলে আপনি একটু ঘুমান।আমি জেগে আছি।খুব ভোরে আমরা ঢাকায় পৌছে যাবো।মেহমুদ বলে
আচ্ছা। রাবেয়া বলে
বাস ছুটে চলেছে তার গন্তব্যপথে
জানে না সামনে কি হবে।।

খুব ভোরে তারা ঢাকায় পৌছায়।মেহমুদ রাবেয়াকে তার রুমে রেখে কাগজপএ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।নিজাম সাহেবের সাথে দেখা করতে হবে।তাকে কাগজপএ গুলো দিতে হবে।এগুলো তিনি কোর্টে জমা দিবেন।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এগুলো শেষ হোক

সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে মেহমুদ দেখে,বাচ্চারা রাবেয়ারা সাথে মিলে মিশে গেছে
মনে হয় কত দিনের চেনাজানা।
সিয়াম যাও পড়তে বস।সিয়াম পড়তে বসে যায়
জারা দুধের গ্লাস পুরোটুকু শেষ করবে
জারা মাথা নাড়ে যে সে করবে।সবাই যেন রাবেয়ার বাধ্যগত।
বাহ্

জারীন কাল রাত থেকে বাড়ি নেই।রাবেয়া আজ রান্নাও করেছে।কাজের লোকগুলোও যেনো ওর কথা শুনছে।মেহমুদের ভালো লাগছে।অনেক দিন পর মনে হয় ঘরে শান্তি লাগতাছে।

রাবেয়া তার ঘরে শুয়ে ছিলো তখন মেহমুদ ঘরে এলো
রাবেয়া খেয়াল করে নাই।
রাবেয়া আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো।মেহমুদ বলে
রাবেয়া চমকে উঠে।সে ধরমরিয়ে উঠে বসে।লোকটা কখন ঘরে ঢুকলো।

ধ্যাত, সে কেনো দেখে নাই
জ্বী,বলুন।আমি শুনছি।রাবেয়া বলে
অনেকক্ষন চুপ করে থাকার পর মেহমুদ বলে,আমি আপনার থেকে বয়সে অনেক বড়।আমাদের বিয়েটা খুব স্বাভাবিক ভাবে হয়নি।এখানে আপনার মতামতের কোন অগ্রাধিকার ছিলো না। থাকলে আমাকে আপনি পছন্দ করতেন কিনা আমার জানা নাই।আপনাকে আমি সেই অগ্রাধিকার দিবো।আপনি ইচ্ছে করলে এই সম্পর্ক রাখতে পারেন বা এর থেকে মুক্তি নিতে পারেন।সবটুকু আপনার উপর।আপনার যে ডিসিশনই হোক না কেনো তাতে আমার পূর্ণ সমর্থন থাকবে।

মেহমুদ রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে উওরের আসা করে
রাবেয়া মাথা নিচু করে বলে একই প্রশ্ন যদি আমি করি উওর কি পাবো?
মেহমুদ একটুক্ষণ চুপ করে থাকে,তারপর বলে
রাবেয়া আমি অনেক অভিমান করে এই বাড়ি ছেড়েছি।
তারপর অনেক চেষ্টা করে আমেরিকায় পাড়ি জমাই।
সেখানে এত সহজ ছিলো না সব কিছু।
একটু একটু করে সব কিছু গড়ি।বয়সটা কখন বেড়ে গেছে টের পাইনি।
অনেক নারী এসেছে কিন্তু সংসার করবো এই রকমভাবে কাউ কে নিয়ে চিন্তা করিনি।কোন বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাই নি।নিজের পিতামাতার অভিজ্ঞতা থেকে আমি তা বুঝেছি।সেখানে শুধুই তিক্ততা ছিলো
তারপর ও আমি আমাদের বিয়ে নামক এই সম্পর্কটাকে সম্মান করি।।
সম্পর্কটাকে আমি পরিপূর্ণ করতে চাই।কিন্তু আমার একটু সময় চাই।
আমার তরফ থেকে আপনার প্রতি কোন অবহেলা ও অস্মমান হবে না।
রাবেয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,ঠিক আছে, আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করবো।

মেহমুদ একটুক্ষণ রাবেয়ার দিকে চেয়ে থাকে।
এই পরিপূর্ণ নারী আজ তার, ইচ্ছে করলেই তাকে বাহুডোরে নিয়ে বক্ষদেেশ নিঃষ্পিষ্ট করতে পারে।ঐ ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের মধ্যে নিয়ে নিঃশোষিত করতে পারে।
না,এটা হয় না।মেহমুদ নিজের আদিম ইচ্ছা কে পরাস্ত করে।সে রুম থেকে বের হয়ে যায়
কি হবে একদিনের আবেগে ভেসে গিয়ে।
পরবর্তীতে সে এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারবে তো
মেহমুদের জীবনে অনেক নারী এসেছে কিন্তু তারা ছিলো কিছু দিনের জন্য।নিজেকে নিয়ে তার ভয়।সম্পর্ক গড়া সহজ কিন্তু তাকে টিকিয়ে রাখা কঠিন।
তার নিজেকে বুঝতে তার সময় লাগবে।
এর মধ্যে রাবেয়ার জীবন নষ্ট করার অধিকার তার নাই
যতদিন না তার কাছে মনে হবে ,এই সম্পর্কটাকে সে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে ততদিন সে এগুবে না।

আস্তে আস্তে মেহমুদের যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসে।
এরমধ্যে কোর্টএর রায় চলে এসেছে।
সোবহান সাহেবের সকল সম্পদ সমান দুইভাগ হবে।মেহমুদ ও মাহিম একমাএ উওরাধিকারী।
মাহিমের অর্বতমানে তার সন্তানরা সমান ভাগ পাবে।যেহেতু তারা নাবালক তাই যে ওদের কার্স্টেডি নিয়েছে সে মাহিমের অংশ দেখাশোনা করবে।
সাবালক হলে তাদের অংশ বুঝিয়ে দিতে হবে।মাহিমের অংশ থেকে জারীন শুধু তার প্রাপ্য অংশটুকু পাবে।যেহেতু বাচ্চারা তাদের চাচা চাচির সাথে থাকতে চায় সেহেতু মেহমুদই সকল সম্পদের একমাত্র উওরাধিকার।তবে কোর্ট সবকিছু লক্ষ রাখবে।

মেহমুদের দিন কাটে রাবেয়া,জারা আর সিয়ামের সাথে দুষ্টমি করতে করতে।
রাবেয়ার এলো মেলো চুল দেখতে ভালো লাগে।
জারা আর সিয়ামের সাথে খুনসুটি করতে ভালো লাগে।
মেহমুদ নিজেও জানে না সে কখন মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেছে।মায়ার অদৃশ্য শিকল তাকে বেঁধে ফেলেছে।

আজ সে চলে যাবে।রাবেয়া ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছে ।
তার মুখে হাসি নেই ।সে কোন কথা বলছে না।
মেহমুদের ফ্লাইট রাত বারোটায়।নয়টার মধ্যে তাকে বের হতে হবে।
সে এক এক করে সকলের কাছ থেকে বিদায় নেয়।
রাবেয়ার সাথে কোন কথা হয় না।শুধু বলে আসি।রাবেয়া মাথা নেড়ে সায় দেয়।
মেহমুদ গাড়িতে উঠে বসে।আমেরিকায় তার অনেক কাজ জমে গেছে।তাকে যেতে হবে।
মেহমুদ জানে রাবেয়া কাঁদছে।
তার মন ও কি কাঁদছে না।মেহমুদের মনটা হু হু করে উঠে।

রাত বারোটা বাজে
রাবেয়া কাঁদছে।হঠাৎ দরজায় নক্ হয়।
সে তাকিয়ে দেখে
মেহমুদ দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।সে কি ভুল দেখছে।
রাবেয়া এক দৌড়ে মেহমুদের বুকে ঝাপিয়ে পরে।
মেহমুদ ও তার বাহুডোরে রাবেয়াকে শক্ত করে ধরে রাখে
রাবেয়া মেহমুদের বুকে মাথা রেখে ফিস ফিস করে বলে,
—তুমি আমাকে ছেড়ে কখনই যাবে না। কখনই না। মনে থাকে যেনো।
—ঠিক আছে যাবো না। তবে আমি আমার পুরো পরিবারবর্গ নিয়ে যাবো।
রাবেয়া , তুমি কি আজ সেই সবুজরং এর শাড়িটা পরবে প্রথম দিনের মতো?
তারপর দুজনে হেসে উঠে।।

অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল ।।

সমাপ্ত ।।

(কিছু কথা।এই গল্পটা গতানুগতিক গল্প থেকে আলাদা ।।

বাস্তবে,
জারা,সিয়ামের জীবনে কেউ আসেনা ওদের আশ্রয় হয় এতিমখানায়।।
বাস্তবে,
রাবেয়ারা আত্মহত্যা করে।ওদের বাঁচাতে কোন হিরো আসেনা।।
বাস্তবে,
মেহমুদরা কখনো ফিরে না।ওরা উন্নত দেশেই সেটেল হয়।

সব সময় দুঃখের গল্প ভালো লাগেনা ।
থাকুক না কিছু গল্প সুখে শান্তি তে।।)

সমাপ্ত।

About Bithi Sultana

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *